বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৩ অপরাহ্ন
ঢাকার মিরপুর-১৪ পুলিশ কমিউনিটি হলের পেছনের সড়কের পাশে সারি সারি ১৫ তলা ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী আবাসন প্রকল্প ‘বিজয় রাকিন সিটি’। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান রাকিন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড উন্নত বিশ্বের আদলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির ৫০ বিঘা জমির ওপর এই কনডোমিনিয়াম প্রকল্প নির্মাণ করেছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম আকারভেদে দেড় থেকে চার কোটি টাকা পর্যন্ত।
তবে প্রকল্পটিতে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের ৪৩ শতাংশ ফ্ল্যাট সমিতির, বাকিগুলো ডেভেলপার কোম্পানির। কিন্তু সমিতির ৮৭০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে অর্ধেকের বেশি চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম ও তার আত্মীয়-স্বজনের নামে রয়েছে অন্তত ৭০টি ফ্ল্যাট। তার প্রভাব বজায় রাখতে পতিত সরকারের মন্ত্রী-এমপিদেরও ফ্ল্যাট দিয়ে অনুগত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ১৯৯৭ সালে ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়, পরে আরও ২৫১ জন যুক্ত হন। তাদের অনুরোধে ১৯৯৯ সালের ২৩ নভেম্বর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ মিরপুর-১৫ নম্বরে ১৬.২ একর জমি বরাদ্দ দেয়। তবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত এই জমি পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।
২০০৮ সালে সমিতি কনকর্ড কনডোমিনিয়ামের সঙ্গে আবাসন প্রকল্পের জন্য চুক্তি করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০১০ সালের ৭ জুন রাকিন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে নতুন চুক্তি হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ১,৯৫০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে সমিতিকে ৮৭০টি ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা। কিন্তু ফ্ল্যাট বণ্টনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। আওয়ামীবিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও ক্ষমতাসীন সরকারের ঘনিষ্ঠদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মোর্শেদুল আলম তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের লোকদের অবৈধভাবে সমিতির সদস্য বানিয়ে তাদের ফ্ল্যাট দিয়েছেন। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া জমিতে নির্মিত ফ্ল্যাটগুলো যেন মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবর্তে ক্ষমতাশালীদের সম্পত্তি হয়ে উঠেছে।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদসহ প্রভাবশালীদের নামে রয়েছে তিন শতাধিক ফ্ল্যাট। এছাড়া, সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম নিজের স্ত্রী, ছেলে, ভাই-বোন, শ্যালক-শ্যালিকা, এমনকি শাশুড়ির নামেও ফ্ল্যাট লিখিয়ে নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের নামে অন্তত দুটি করে ফ্ল্যাট রয়েছে।
এ বিষয়ে কয়েকবার চেষ্টা করেও মোর্শেদুল আলমের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত সদস্যদের হাতে ফ্ল্যাট ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের দাবি, এই দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নূরুল বাসির গণমাধ্যমকে জানান, ‘সমিতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে আমরা জানি। যদি কেউ অবৈধ উপায়ে ফ্ল্যাট বণ্টনে জড়িত থাকে এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রাকিন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কোম্পানি সচিব আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই চুক্তি অনুসারে ৮৭০টি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিয়েছি। সমিতির মধ্যে কী হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা জানি না।’
এই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আজ বঞ্চিত। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় দেশের বীর সন্তানদের জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাট অন্যদের দখলে চলে যাচ্ছে। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা সুবিচার প্রত্যাশা করছেন।
সূত্র: কালবেলা